Saturday, 6 December 2014

‘রোবট সভ্যতা’? মানবসভ্যতা যে থাকছেই না!

http://www.impactlab.net/wp-content/uploads/2010/07/Robot-Man-475.jpg
একবিংশ শতকের মাঝামাঝি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সংক্ষপে এআই) নাকি মানুষের সম্মিলিত বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়িয়ে যাবে। রোবট, কম্প্যুটার, গেজেট মানবসমাজকে নিয়ন্ত্রণ করবে। লক্ষণ-সক্ষণও সেরকমই বটে!
তা’হলে কি হবে সেই সভ্যতার নাম? ‘রোবট সভ্যতা’? মানবসভ্যতা যে থাকছেই না!
চিন্তার বিষয় হচ্ছে এআই সম্পূর্ন লজিকনির্ভর। অ্যালগরিদম, প্রোগ্রামিং ইত্যাদি। কিন্তু রোবটকে দিয়ে মানবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাতে হলে তার অনেক আবেগ লাগবে। ইতোমধ্যে অনেকগুলো সায়েন্স ফিকশন গল্প-উপন্যাস-সিনেমায় আবেগ ও বোধবুদ্ধিওয়ালা রোবটদের কাহিনী শুনানো হয়েছে অবশ্য! দেখানো হয়েছে রোবট প্রেম করছে। হিংসা-ঈর্ষা ভিলেনবাজি-কুংফু-কারাতেও করছে।
সমস্যা হচ্ছে মানুষের ব্যাপারেই জ্ঞানজগত এখনো নিশ্চিত নয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে আবেগ না যুক্তি— কোনটির শক্তি বেশি? রোবটে আবেগ ঢোকানোর মাত্রা-অনুপান প্রোগ্রামিং-এ সামান্য ভুলভাল হলেতো সিনেমাগুলোয় দেখা অ্যাপোক্যালিপ্স বা মহাপ্রলয় ঘটে যাবার কল্পনাগুলোই সত্য হয়ে যাবে!
তাই গভীর আগ্রহে ‘ইমোশন’ এবং ‘লজিক’—এই দুটো বিষয়ে বিভিন্ন দর্শন পড়তে শুরু করেছিলাম। দীর্ঘদিনের বুঝার ইচ্ছা— কতটুকু যুক্তি আর কতটুকুই বা আবেগ নিয়ে মানব জীবন! ।

দর্শন পাঠ বিরক্তিকর ও হতাশাকর হয়ে উঠল যখন দেখলাম বিশ্ব-জ্ঞানজগতটিও ডেমোক্রেটিক-রিপাব্লিকান, লিব্যারাল-কঞ্জার্ভেটিভ বা আওয়ামী-বিএনপির মত দুই ভাগ হয়ে গেছে। ‘আবেগ’ সঙ্ক্রান্ত আলোচনার দায়িত্ব নিয়েছে মনোবিজ্ঞান। আর ‘যুক্তি’ আলোচনার ভার পড়েছে দর্শনশাস্ত্রের ঘাড়ে। এরকম কেন হবে? এই দু’য়ের মিলিত রসায়নের দুই শিবিরে ভাগ হয়ে যাওয়াইতো বড় কুলক্ষণ! সার্ত্রেসহ অস্তিত্ববাদী দার্শনিকরা ‘আবেগ’ বিষয়ে কথাবার্তা না বললে দর্শনশাস্ত্রে আবেগের কোন জায়গাই থাকতনা সম্ভবত!
.......................................... .......................................
এই হতাশার মধ্যে আশার ভাষা নিয়ে বরাবরের মতই আবারো সামনে এসে দাঁড়ালেন কবিগুরু। আবারো পাঠ করছি—
http://cms.outlookindia.com/Uploads/Rabindranath-Tagore-Young_2.jpg
“যখন নৌকায় উঠিলেন এবং নৌকা ছাড়িয়া দিল, বর্ষাবিস্ফারিত নদী ধরণীর উচ্ছলিত অশ্রুরাশির মতো চারি দিকে ছলছল করিতে লাগিল, তখন হৃদয়ের মধ্যে অত্যন্ত একটা বেদনা অনুভব করিতে লাগিলেন-- একটি সামান্য গ্রাম্য বালিকার করুণ মুখচ্ছবি যেন এক বিশ্বব্যাপী বৃহৎ অব্যক্ত মর্মব্যথা প্রকাশ করিতে লাগিল। একবার নিতান্ত ইচ্ছা হইল, "ফিরিয়া যাই, জগতের ক্রোড়বিচ্যুত সেই অনাথিনীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসি"- কিন্তু তখন পালে বাতাস পাইয়াছে, বর্ষার স্রোত খরতর বেগে বহিতেছে, গ্রাম অতিক্রম করিয়া নদীকূলের শ্মশান দেখা দিয়াছে- এবং নদীপ্রবাহে ভাসমান পথিকের উদাস হৃদয়ে এই তত্ত্বের উদয় হইল, জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ, কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কী! পৃথিবীতে কে কাহার!
কিন্তু রতনের মনে কোনো তত্ত্বের উদয় হইল না। সে সেই পোস্টআপিস গৃহের চারি দিকে কেবল অশ্রুজলে ভাসিয়া ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছিল। বোধ করি তাহার মনে ক্ষীণ আশা জাগিতেছিল, দাদাবাবু যদি ফিরিয়া আসে-- সেই বন্ধনে পড়িয়া কিছুতেই দূরে যাইতে পারিতেছিল না। হায় বুদ্ধিহীন মানবহৃদয়! ভ্রান্তি কিছুতেই ঘোচে না, যুক্তিশাস্ত্রের বিধান বহুবিলম্বে মাথায় প্রবেশ করে, প্রবল প্রমাণকেও অবিশ্বাস করিয়া মিথ্যা আশাকে দুই বাহুপাশে বাঁধিয়া বুকের ভিতরে প্রাণপণে জড়াইয়া ধরা যায়, অবশেষে একদিন সমস্ত নাড়ী কাটিয়া হৃদয়ের রক্ত শুষিয়া সে পলায়ন করে, তখন চেতনা হয় এবং দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশে পড়িবার জন্য চিত্ত ব্যাকুল হইয়া উঠে”।
............................ .................... .............................. ....
কিয়ের্কেগার্দ, সার্ত্রে থাক! বরাবরের মত উত্তর মিলল রবি ঠাকুরে এসেই।
অ্যাপোক্যালিপ্সমুক্ত রোবট সভ্যতার জন্য রোবটদের রবীন্দ্রনাথ পড়তে পারায় সক্ষমতাদানই যথেষ্ঠ হবে!

No comments:

Post a Comment